শেষ কবে পুরো একটা দিন ফোন ছাড়া কাটিয়েছেন?
অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম আমাদের মনোযোগ কমিয়ে দিতে পারে। জেনে নিন কেন আমরা বারবার ডিসট্র্যাক্টেড হই, মাল্টিটাস্কিং আসলে কতটা কাজের, আর কীভাবে ছোট বিরতি, ভালো ঘুম ও সচেতন ফোন ব্যবহার আমাদের মনোযোগ ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করতে পারে।
%20Medium.jpeg?alt=media&token=546a52e9-531d-4027-b299-f6f4630a4cd6)
Mahbub Ul Asem
Psychologist

অনেকের পক্ষেই ফোন-ছাড়া এক ঘণ্টার কথাও মনে করা কঠিন। বর্তমানে ইন্টারনেট, স্মার্টফোন, ল্যাপটপ আমাদের জীবনের সাথে মিশে গেছে । এগুলো আমাদের কাজ সহজ করেছে ঠিকই, কিন্তু একই সঙ্গে তৈরি করেছে ডিসট্র্যাকশন। তাই গভীর মনোযোগ দিয়ে কিছু করা দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
সত্যিই কি আমাদের মনোযোগ কমে যাচ্ছে?
মাইক্রোসফটের ২০১৫ সালের এটেনশন স্টাডি বলছে, হ্যাঁ, কমছে। গত ২০–২৫ বছরে মানুষের মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বিশেষ করে কাজের সময় আমরা কতক্ষণ একটা স্ক্রিনে মনোযোগ ধরে রাখতে পারি, সেটা নাটকীয়ভাবে কমেছে। এই বিষয়টা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন ড. গ্লোরিয়া মার্ক (Mark, 2023)। তিনি দেখেছেন
- ২০০৪ সালে মানুষ গড়ে ২.৫ মিনিট একটা স্ক্রিনে মনোযোগ দিত
- ২০১২ সালে সেটা নেমে আসে ৭৫ সেকেন্ডে
- আর এখন গড়ে মাত্র ৪৭ সেকেন্ড
মানে অর্ধেকের বেশি সময়েই আমরা ৪০ সেকেন্ডের কম সময় মনোযোগ ধরে রাখছি।
কিন্তু মনোযোগ মানে কি ?
আমরা সবাই ভাবি, মনোযোগ মানে কোনো কিছুর দিকে তাকিয়ে থাকা।
কিন্তু আসলে মনোযোগেরও ধরন আছে। ড. মার্ক বলছেন, আমরা দৈনন্দিন জীবনে মূলত দুই ধরনের মনোযোগ ব্যবহার করি
১। ফোকাসড অ্যাটেনশন
যখন আমরা কোনো কাজে মনোযোগীও থাকি, আবার সেটা আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জিংও হয়।
এই ধরনের মনোযোগ সাধারণত
- সকালে
- আর দুপুরের পর (২–৩টার দিকে) বেশি কাজ করে।
২। রট অ্যাক্টিভিটি (Routine work" or "mechanical tasks)
যেখানে কাজটা খুব সহজ, চ্যালেঞ্জ নেই, কিন্তু আমরা তাতে জড়িয়ে পড়ি। যেমন
- সোশ্যাল মিডিয়া
- খবর পড়া
- সহজ গেম খেলা
এই কাজগুলো আমরা সারাদিনই করি, কোনো নির্দিষ্ট সময় ছাড়াই।
যেখানে ফোকাসড অ্যাটেনশন আমাদের সৃজনশীলতা ও দক্ষতা বাড়ায়, সেখানে রুটিন অ্যাক্টিভিটি প্রায়ই আমাদের সময় নষ্ট করে, কিন্তু আমরা সচেতনভাবে তা দেখি না। এ কারণে অনেকেই মনে করে, “আমি তো একসাথে অনেক কাজ করতে পারি!” অর্থাৎ মাল্টিটাস্কিং করতে পারি।
মাল্টিটাস্কিং কি আসলেই কাজের?
গবেষণা (Rosen, 2008) বলছে, প্রোডাকটিভ মাল্টিটাস্কিং আসলে একটা মিথ। কারণ
- বারবার মনোযোগ বদলালে স্ট্রেস বাড়ে
- হার্ট রেট বাড়ে
- ভুলের সংখ্যা বাড়ে
- কাজ শেষ করতে বেশি সময় লাগে
এর কারণ, প্রতিবার মনোযোগ বদলাতে গেলে আমাদের মাথাকে নতুন করে “সেট” হতে হয়। একে বলে switch cost। ধরুন, আপনি কিছু লিখছেন। হঠাৎ ইমেইল দেখলেন। আবার ফিরে এসে লিখতে বসলেন। তখন মাথায় প্রশ্ন আসে, “আমি কী লিখছিলাম?” এই ভাবনাটাই সময় আর শক্তি খরচ করে। এমন পরিস্থিতি আমাদের প্রায়ই ঘটে, বিশেষ করে যখন আমরা একসাথে অনেক কাজ করার চেষ্টা করি।
মাল্টিটাস্কিং এক কাজ থেকে অন্য কাজে শিফট করলে যদি শক্তি খরচ হয়, ভুল বাড়ে, সময় নষ্ট হয় তাহলে বিরত নিলেও তো আমরা আমাদের অ্যাটেনশন অন্যদিকে শিফট করে আবার কাজে ফিরে আসি।
তাহলে কি বিরতি নেওয়া খারাপ?
একদমই না। বরং বিরতি নেওয়া খুবই দরকার। সমস্যা হলো, আমরা এখন ঠিকভাবে বিরতি নিই না। ভালো বিরতি মানে
- কাজের একটা স্বাভাবিক জায়গায় থামা
- যেমন অনুচ্ছেদ শেষ করে
- বা একটা অংশ শেষ করে
কাজের মাঝখানে হঠাৎ থেমে গেলে মাথার ওপর চাপ আরও বেড়ে যায়।
ইন্টারনেট ব্লকার, পোমোডোরো—এসব কি কাজের?
ড. মার্ক বলছেন
এটা পুরোপুরি ব্যক্তিভেদে আলাদা।
- যাদের নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ কম, তারা ব্লকার অ্যাপ থেকে উপকার পেতে পারেন
- কিন্তু যাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ ভালো, তাদের ক্ষেত্রে এসব উল্টো ক্ষতি করতে পারে
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিজের শক্তি আর মনোযোগের সীমা বোঝা কখন বিরতি দরকার, সেটা নিজে বুঝতে শেখা। একটার পর একটা জুম মিটিং, যেখানে ব্রেনের কোনো বিশ্রাম থাকে না। এবং
শিশুদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আরও চিন্তার
ড. মার্ক এই ব্যাপারে চিন্তিত। কারণ
- ২–৪ বছরের বাচ্চারা দিনে গড়ে ২.৫ ঘণ্টা স্ক্রিন দেখে
- ৫–৮ বছরে সেটা বেড়ে ৩ ঘণ্টা হয়
এত ছোট বয়সে বাচ্চাদের মস্তিষ্কের যে অংশ আত্মনিয়ন্ত্রণ শেখায়, সেটা এখনো পুরোপুরি তৈরি হয় না।
স্ক্রিনে অতিরিক্ত সময় কাটালে
- মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়
- শেখার ক্ষমতা কমে
তাই শিশুদের জন্য অফ-স্ক্রিন কাজ, খেলা, বই পড়া, বাইরে সময় কাটানো, এগুলো ভীষণ জরুরি।
মনোযোগ বাড়ানো যায় কীভাবে?
প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিজের মানসিক শক্তির “ট্যাংক” ভরতি রাখা। এর সবচেয়ে সহজ উপায়
- পর্যাপ্ত ঘুম
ঘুম কম হলে মনোযোগ কমে যায়। তখন মানুষ সহজ কাজ, সোশ্যাল মিডিয়া, স্ক্রলিং, এই দিকে বেশি ঝোঁকে।
পরিশেষে, ইন্টারনেট আমাদের জীবনের বিশাল একটা সম্পদ।
সমস্যা ইন্টারনেট না, সমস্যা হলো আমরা সেটাকে কীভাবে ব্যবহার করছি।
এই উত্তর খুঁজতেই গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন ড. গ্লোরিয়া মার্ক।
এখনই রিল্যাক্সি অ্যাপ ডাউনলোড করুন
আপনার প্রিয়জনের পাশে থাকুন এবং কাউন্সেলিং নিতে তাদের উদ্বুদ্ধ করুন।
*https://sherpapg.com/wp-content/uploads/2017/12/MAS.pdf
*Mark, G. (2023). Attention Span.
Rosen, C. (2008). The Myth of Multitasking. The New Atlantis, (20), 105–110. http://www.jstor.org/stable/43152412
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
অতিরিক্ত ফোন ব্যবহার কি সত্যিই মনোযোগ কমায়?
হ্যাঁ, অতিরিক্ত ফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহার আমাদের বারবার ডিসট্র্যাক্টেড করে। ফলে একটানা কোনো কাজে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে যায়।
মাল্টিটাস্কিং করলে কি কাজ দ্রুত হয়?
সবসময় না। একসাথে অনেক কাজ করতে গেলে বারবার মনোযোগ বদলাতে হয়, এতে ভুল বাড়ে, স্ট্রেস বাড়ে এবং কাজ শেষ করতে বেশি সময় লাগতে পারে।
মনোযোগ বাড়াতে কী করা যায়?
ভালো ঘুম, নির্দিষ্ট সময় পর বিরতি নেওয়া, নোটিফিকেশন কমানো এবং কাজের সময় সোশ্যাল মিডিয়া থেকে দূরে থাকা মনোযোগ বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।
শিশুদের জন্য স্ক্রিন টাইম কেন নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি?
কারণ ছোট বয়সে শিশুর মস্তিষ্ক এখনও বিকাশের পর্যায়ে থাকে। অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম তাদের মনোযোগ, শেখার ক্ষমতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণে প্রভাব ফেলতে পারে।
Did you find this article helpful?
%20Medium.jpeg?alt=media&token=546a52e9-531d-4027-b299-f6f4630a4cd6)
Mahbub Ul Asem
Psychologist
I help people feel better. With several years of academic and practical experience, I am committed to offering thoughtful, evidence-based psychological care.