আপনি বা আপনার শিশু কি মনোযোগ ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন? এটি ADHD-এর লক্ষণ হতে পারে!

আপনার সন্তান কি পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারে না? কিংবা আপনি কি গুরুত্বপূর্ণ কাজ শুরু করেও শেষ করতে পারেন না? মনে হয় সব কিছুই গুলিয়ে যাচ্ছে? এটা শুধু আলসেমি নয়, হতে পারে ADHD (Attention Deficit Hyperactivity Disorder) এর লক্ষণ!

অনেকে মনে করেন, ADHD মানেই শুধু দুষ্টুমি বা ভুলে যাওয়া, যা সময়ের সাথে ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু আসলে এটি একটি মানসিক অবস্থা, যা শিশুকাল থেকে শুরু হয়ে বড় হওয়ার পরেও থাকতে পারে। ADHD থাকলে কেউ সহজে মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না, খুব বেশি অস্থির থাকে বা আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে সমস্যা হয়।

এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?

ভাবুন, এক শিশু ক্লাসে বসে আছে, কিন্তু শিক্ষক কী বলছেন কিছুই মাথায় ঢুকছে না। অন্যদিকে, একজন বড় মানুষ কাজের শেষ সময় ঘনিয়ে এলেও কাজ শুরু করতে পারছেন না। এই সমস্যাগুলো শুধু বিরক্তিকর নয়, ব্যক্তির আত্মবিশ্বাসের ওপরও খারাপ প্রভাব ফেলে। শিশুরা পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়তে পারে, বন্ধুত্বে সমস্যা হতে পারে, আর বড়দের ক্ষেত্রে চাকরি বা ব্যক্তিগত জীবনে ঝামেলা দেখা দিতে পারে।

ADHD কী এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?

ADHD হলো একটি নিউরোবায়োলজিক্যাল ডিজঅর্ডার, যা ব্যক্তির মনোযোগ ধরে রাখা, অস্থিরতা ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের সমস্যার কারণে দেখা দেয়। এটি শিশুকাল থেকে শুরু হয়ে প্রাপ্তবয়স্ক বয়সেও থাকতে পারে।

এই সমস্যাটি একজন শিশুর স্কুলের পারফরম্যান্স, বন্ধুত্ব, এবং আত্মবিশ্বাসে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এটি কর্মক্ষেত্র, সম্পর্ক, এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তোলে। তাই ADHD সঠিকভাবে চিহ্নিত করা এবং যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ADHD-এর সাধারণ লক্ষণ

ADHD-এর লক্ষণ মূলত তিনটি প্রধান ক্যাটাগরিতে বিভক্ত:

১. মনোযোগের অভাব

  • শিশুরা ক্লাসে পড়ার সময় সহজেই মনোযোগ হারিয়ে ফেলে।
  • হোমওয়ার্ক বা পরীক্ষার সময় বসে থাকলেও কাজ শেষ করতে পারে না।
  • বারবার জিনিসপত্র হারিয়ে ফেলে (যেমন, বই, কলম, খেলনা) ।
  • একসাথে অনেক কিছু শুরু করলেও কিছুই ঠিকঠাক শেষ করতে পারে না।
  • প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে অফিসের কাজ বা ব্যক্তিগত দায়িত্বে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে যায়।

উদাহরণ: রিয়াদ, ১০ বছর বয়সী, স্কুলে গেলে বই-খাতা ভুলে যায় এবং পড়ার সময় ৫ মিনিটের বেশি মনোযোগ দিতে পারে না। একইভাবে, ৩৫ বছর বয়সী রফিক অফিসের মিটিংয়ে উপস্থিত থাকলেও, তিনি কী আলোচনা হয়েছে তা বুঝতে পারেন না।

২. অতিরিক্ত অস্থিরতা

  • শিশুরা সবসময় কিছু না কিছু করতে চায়, যেমন—দৌড়াদৌড়ি করা বা চেয়ারে বসে না থাকা।
  • বড়দের ক্ষেত্রে এটি অন্যভাবে প্রকাশ পেতে পারে, যেমন—এক জায়গায় বেশি সময় বসে থাকতে না পারা বা বারবার ফোন চেক করা।
  • অনেক সময় না ভেবে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে, যা পরে সমস্যা তৈরি করে।
  • সামাজিক পরিস্থিতিতে কথা না ভেবে বলে ফেলে, যার ফলে অন্যরা বিরক্ত হয়।

উদাহরণ: ৮ বছর বয়সী আদিব ক্লাসে বসে থাকতে পারে না, বারবার উঠে দৌড়াতে চায়। অন্যদিকে, ২৮ বছর বয়সী তামান্না প্রায়শই না ভেবে কেনাকাটা করে এবং পরে অনুশোচনা করে।

৩. আবেগ নিয়ন্ত্রণের সমস্যা

  • শিশুরা সহজেই রেগে যায় বা ধৈর্য হারায়।
  • কোনো কিছুতে বাধা পেলে তারা চিৎকার বা কান্না শুরু করে।
  • প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে, তারা হঠাৎ রেগে যান বা দুঃখিত হন এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না।

উদাহরণ: ৬ বছর বয়সী সাদিয়া যখন তার প্রিয় খেলনাটি না পায়, তখন পুরো ঘর এলোমেলো করে দেয়। অন্যদিকে, ৩২ বছর বয়সী রাশেদ যখন ট্রাফিকে আটকে যান, তখন এতটাই রেগে যান যে অন্য গাড়ির চালকদের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েন।

ADHD কেন হয়? ৪টি প্রধান কারণ

ADHD-এর সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি, তবে গবেষণায় কিছু প্রধান কারণ পাওয়া গেছে, যা ADHD হওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

১. জেনেটিক্স (বংশগত কারণ):

পরিবারে যদি কারও ADHD থাকে, তাহলে শিশুর ADHD হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, ADHD আক্রান্ত শিশুদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও অনেক সময় একই ধরনের লক্ষণ থাকে। অর্থাৎ, এটি বংশগতভাবে প্রভাবিত হতে পারে, যেখানে বাবা-মা বা নিকটাত্মীয়দের মধ্যে ADHD থাকলে শিশুর মধ্যেও একই প্রবণতা দেখা দিতে পারে।

২. মস্তিষ্কের কার্যপ্রক্রিয়া:

ADHD মূলত মস্তিষ্কের কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চলের কার্যক্রমের সাথে সম্পর্কিত। মস্তিষ্কে ডোপামিন ও নরএপিনেফ্রিন নামক নিউরোট্রান্সমিটারের ভারসাম্যহীনতা ADHD-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে। এই নিউরোট্রান্সমিটারগুলো মনোযোগ ও আচরণ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। যদি এগুলোর ঘাটতি বা অপ্রতুলতা থাকে, তাহলে শিশুর মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে যায়,Impulsivity (হঠাৎ করে কাজ করা) বৃদ্ধি পায় এবং অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।

৩. পরিবেশগত কারণ:

গর্ভাবস্থায় মায়ের জীবনযাত্রার ধরন শিশুর ভবিষ্যৎ মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বড় প্রভাব ফেলে। যদি গর্ভবতী মা ধূমপান করেন, অ্যালকোহল বা মাদক সেবন করেন, কিংবা কোনো কারণে পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ না পায়, তবে শিশুর মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হতে পারে, যা ADHD-এর ঝুঁকি বাড়ায়।

৪. অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম ও অনিয়ন্ত্রিত রুটিন:

শিশুরা যদি নিয়মের বাইরে অতিরিক্ত সময় টিভি, মোবাইল, ট্যাবলেট বা ভিডিও গেমে কাটায়, তবে এটি তাদের মনোযোগ ক্ষমতা ও আচরণগত বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। নিয়মিত শারীরিক ক্রিয়াকলাপ ও সামাজিক যোগাযোগের অভাব ADHD-এর লক্ষণগুলোকে আরও তীব্র করতে পারে। বিশেষ করে ছোটবেলায় যদি শিশুর রুটিন অনিয়ন্ত্রিত হয়, পর্যাপ্ত ঘুম না পায়, বা অতিরিক্ত উদ্দীপনার (stimuli) মধ্যে বড় হয়, তবে এটি মনোযোগের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।

এই সমস্ত কারণ এককভাবে ADHD সৃষ্টি না করলেও একাধিক কারণ মিলিতভাবে ADHD হওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিতে পারে। এজন্য বংশগত ও পরিবেশগত উভয় দিক থেকেই সতর্ক থাকা জরুরি।

ADHD-এর প্রভাব

যদি ADHD নিয়ন্ত্রণে আনা না হয়, তাহলে এটি বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে:

ADHD বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানা রকম সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। এখানে আরও কিছু উদাহরণ দেওয়া হলো—

শিক্ষাজীবনে সমস্যা:

  • ক্লাসে মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা, ফলে লেকচার ঠিকমতো বুঝতে না পারা।
  • হোমওয়ার্ক বা অ্যাসাইনমেন্ট শেষ করতে দেরি হওয়া বা ভুলে যাওয়া।
  • পরীক্ষার হলে প্রশ্নপত্র পড়তে গিয়ে ধৈর্য হারানো এবং ভুল উত্তর লেখা।
  • দীর্ঘ সময় ধরে পড়াশোনায় বসতে কষ্ট হওয়া এবং মাঝেমধ্যেই অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়া।

কর্মজীবনে সমস্যা:

  • একসঙ্গে একাধিক কাজ শুরু করা কিন্তু শেষ করতে না পারা।
  • সময়মতো কাজ শেষ করতে না পারায় সহকর্মীদের সঙ্গে মনোমালিন্য হওয়া।
  • অফিস মিটিংয়ে মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা হওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভুলে যাওয়া।
  • পরিকল্পনা করতে ও কাজকে অগ্রাধিকার দিতে সমস্যা হওয়া, ফলে কাজের চাপ বেড়ে যাওয়া।

ব্যক্তিগত সম্পর্কের সমস্যা:

  • কথা বলার সময় অন্যের কথা কেটে দেওয়া বা ধৈর্য ধরে শোনা না পারা।
  • পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভুলে যাওয়া বা অপ্রয়োজনীয় তর্কে জড়িয়ে পড়া।
  • বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হওয়া কারণ সময়মতো যোগাযোগ না করা বা পরিকল্পনা বাতিল করা।
  • রোমান্টিক সম্পর্কে ভুলে যাওয়া, অনিয়মিত যোগাযোগ, বা হুটহাট সিদ্ধান্ত নেওয়া।

আত্মবিশ্বাসের অভাব:

  • বারবার ভুল করায় নিজের ওপর ভরসা হারানো ও হতাশ হয়ে পড়া।
  • “আমি কিছুই ঠিকভাবে করতে পারি না”— এমন নেতিবাচক ধারণা তৈরি হওয়া।
  • অন্যদের তুলনায় নিজেকে কম যোগ্য মনে করা এবং নিজেকে নিয়ে অনিরাপত্তা বোধ করা।
  • অতীতের ব্যর্থতার কথা মনে করে নতুন কিছু করার আগ্রহ হারানো।

এই সমস্যাগুলো ব্যক্তি বিশেষে ভিন্ন হতে পারে, তবে সময়মতো সঠিক সহায়তা পেলে ADHD-সম্পর্কিত চ্যালেঞ্জগুলো দক্ষতার সঙ্গে সামলানো সম্ভব।

ADHD নিয়ন্ত্রণে করণীয়: ৫টি কার্যকর কৌশল

ADHD মানে এই নয় যে জীবন থেমে যাবে। কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করলে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

থেরাপির মাধ্যমে কৌশল শেখা: ADHD থাকলে কগনিটিভ বিহেভিয়োরাল থেরাপি (CBT) ও অন্যান্য কাউন্সেলিং পদ্ধতি খুব কার্যকর হতে পারে।

নিয়মিত ব্যায়াম ও ভালো রুটিন মেনে চলা: ব্যায়াম মনোযোগ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

মাইন্ডফুলনেস ও মেডিটেশন: এটি মনকে শান্ত ও সংযত রাখতে সাহায্য করে।

সঠিক গাইডলাইন অনুসরণ করা: ADHD ম্যানেজমেন্টের জন্য একজন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

রিল্যাক্সি ADHD থেরাপি: আপনার জন্য সেরা সমাধান!

ADHD নিয়ে যদি আপনি বা আপনার সন্তান সংগ্রাম করেন, তবে পেশাদার থেরাপি নিতে দেরি করবেন না। রিল্যাক্সির অভিজ্ঞ থেরাপিস্টরা ADHD নিয়ন্ত্রণে বিশেষ কাউন্সেলিং সেশন পরিচালনা করে, যেখানে ADHD থাকা ব্যক্তিরা কীভাবে মনোযোগ বৃদ্ধি করবেন, অস্থিরতা কমাবেন, এবং ব্যক্তিগত ও কর্মজীবনে সফল হবেন তা শিখতে পারেন।

👉 Relaxy-তে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের গাইডলাইনে ADHD ম্যানেজ করুন

 👉 ADHD কাউন্সেলিং সেশন বুক করুন।

ADHD উপেক্ষা না করে সঠিক ব্যবস্থা নিন, কারণ আপনার মানসিক সুস্থতাই আপনার শক্তি!

Comments

Write a comment